পান্না, রাজশাহী ব্যুরো :গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ, আইনি সহায়তা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এই কর্মসূচির আয়োজন করে।
গুমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ পালন উপলক্ষে শনিবার (২৩ মে) বেলা সাড়ে ১০টায় রাজশাহী মহানগরীর অলোকার মোড় চেম্বার ভবনের সামনে মানববন্ধনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাজশাহী মহানগর ও জেলার প্রায় অর্ধশতাধিক মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক অংশ নেন।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন অধিকার রাজশাহীর সমন্বয়কারী ও রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি মঈন উদ্দিন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন হাবিবুল্লাহ মোহাম্মদ কাউছারী। বক্তব্য রাখেন মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক রাসেদুল হক ফিরোজ, এম শামিম আক্তার, হুজাইফা, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী জুলইকরাম ইবতিদা এবং ফটোসাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী আসাদুজ্জামান আসাদ। এ সময় গুম হওয়া পরিবারের সদস্য উম্মে কুলসুম জেমি সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
বক্তারা বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলো এখনো চরম অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আইনি স্বীকৃতি না থাকায় অনেক পরিবার ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজ এবং আর্থিক সহায়তা পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়ছে।
তারা আরও বলেন, সরকার চাইলে এসব পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ সহজেই নিশ্চিত করতে পারে। প্রিয়জনদের হয়তো আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, তবে তাদের ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বক্তারা অভিযোগ করেন, দেশে এখনো গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে গুমের আতঙ্ক পুরোপুরি দূর হয়নি। অনেক পরিবার মামলা করতে গিয়ে হয়রানি ও হুমকির মুখে পড়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
তাদের মতে, গুম বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি অধ্যায়। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে আবারও গুম ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। তাই মানবাধিকার সুরক্ষা ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও স্বচ্ছ আইন প্রণয়ন জরুরি।
বক্তারা আরও বলেন, গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন না হলে দেশে ভয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও গভীর হবে। একই সঙ্গে গুমকে অস্বীকার করে বিকল্প বর্ণনা তৈরির চেষ্টারও সমালোচনা করেন তারা।
জানানো হয়, প্রতি বছর মে মাসের শেষ সপ্তাহে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘গুমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ’ পালন করা হয়। ১৯৮১ সালে দক্ষিণ আমেরিকার সংগঠন ‘ফেডেফাম’ প্রথম এই কর্মসূচি শুরু করে, যা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়।
বক্তারা অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে গুমকে ব্যবহার করা হয়েছে। সে সময় গোপন বন্দিশালা গড়ে তুলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী ও কথিত জঙ্গিদের আটকে রাখা হতো বলেও দাবি করা হয়।
মানববন্ধনে অধিকার-এর পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- গুম প্রতিরোধ আইন জাতীয় সংসদে দ্রুত পাস করা, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা, ভারতের কারাগারে কোনো বাংলাদেশি গুমের শিকার ব্যক্তি আটক আছেন কি না সে বিষয়ে কূটনৈতিকভাবে অনুসন্ধান, গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং জড়িতদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের আওতায় আনা।
বক্তারা জানান, গুমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের অংশ হিসেবেই এই কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
